শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০২ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
বাগেরহাটে কড়ে দিঘি দখলমুক্ত করার দাবিতে মানববন্ধন রুপসার জাবুসায় জাকজমকপূর্ণ ৪ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত: জাবুসা ইয়াং বয়েজ চ্যাম্পিয়ন রামপালের বাঁশতলি ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী বিএনপি নেতা এস এম আব্দুল্লাহ’র গণসংযোগ বিএনপি নেতা জাফর ইকবালকে নিয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে মানববন্ধন, বোমারু মিজানকে আটকের দাবি সুন্দরবনে ২১ জেলে অপহৃত, চার দিনেও মেলেনি সন্ধান চাবির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ভ্যান চালকের চক্ষু; বিএনপি নেতার সেচ্ছাচারিতা, বিচারের দাবীতে স্থানীয় জনগণের মানববন্ধন উপকূলের মানুষের জীবন চলে বাঘ কুমিরের আর প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে রামপালে আহাদ হত্যা মামলা, ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রধান দুই আসামিকে আটক করেছে এসআরবি-৬ খুলনাঞ্চলে পাটকাঠি বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন কৃষকরা সোলাদানায় ১৭ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে বাপ্পির মতবিনিময়
নোটিশ :
স্বাধীন বাংলা সংবাদে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে , আমাদের ওয়েব সাইট পরিক্ষা মূলক সম্প্রচার করা হচ্ছে...01711439614

খুলনাঞ্চলে পাটকাঠি বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন কৃষকরা

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: / ৮১ টাইম ভিউ
আপডেট সময়: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০২ পূর্বাহ্ন

খুলনাঞ্চলে পাটের আঁশের পাশাপাশি এখন পাটকাঠি বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন কৃষকরা। আগে পাটকাঠি শুধু অবহেলায় ফেলে রাখা হতো বা রান্নার সাধারণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো, তবে বর্তমানে এর বাণিজ্যিক চাহিদা ও ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে গেছে। রান্নার কাজে কাঠের বিকল্প হিসেবে পাটকাঠির ব্যবহার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গ্রামের পাশাপাশি শহরের বাজারেও এর ভালো চাহিদা রয়েছে। পটল, শসা ও অন্যান্য লতানো সবজির জাংলা বা মাচা তৈরির জন্য কৃষকরা পাটকাঠি ব্যবহার করেন। পাট চাষে যে খরচ হয়, পাট বিক্রির পাশাপাশি পাটকাঠি বিক্রি করে সেই খরচের একটা বড় অংশ উঠে আসে, যা কৃষকদের মনে বাড়তি স্বস্তি এনে দেয়। স্থানীয় বাজারে মানভেদে প্রতি আঁটি পাটকাঠি ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

সূত্রমতে, খুলনা কৃষি অঞ্চলের চার জেলা খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইলে এবার পাটের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। ৩৮ হাজার ২৮৭ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ৩৮ হাজার ৩৬১ হেক্টরে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, উৎপাদন হতে পারে ৯০ হাজার ৫৩৫ মেট্রিক টন। গত বছরের স্থানীয় বাজারদর ধরে এই পাটের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৯০০ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। সংখ্যাটি বড়। কিন্তু এই ৯০০ কোটি টাকা কৃষকের হাতে কতটা থাকবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ কৃষি বিভাগের এই হিসাব করা হয়েছে প্রতি মণ পাটের দাম ৪ হাজার টাকা ধরে। অথচ চলতি মৌসুমে কৃষক শেষ পর্যন্ত কী দামে পাট বিক্রি করতে পারবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এর সঙ্গে আছে বীজ, সার, জমি প্রস্তুত, শ্রমিকের মজুরি, পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া, শুকানো ও পরিবহনের খরচ। ফলে ৯০০ কোটি টাকার সম্ভাব্য বাণিজ্য আর কৃষকের প্রকৃত আয় এক বিষয় নয়।

চার জেলার মধ্যে খুলনা ছাড়া বাকি তিন জেলাতেই এবার পাটের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। খুলনায় ১ হাজার ২৫৭ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ১ হাজার ২৩০ হেক্টর। অর্জনের হার ৯৭ দশমিক ৯ শতাংশ। বাগেরহাটে ১ হাজার ১২০ হেক্টরের বিপরীতে ১ হাজার ৯৩৯ হেক্টর, সাতক্ষীরায় ১১ হাজার ৬১০ হেক্টরের বিপরীতে ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর এবং নড়াইলে ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টরের বিপরীতে ২৩ হাজার ৫১৭ হেক্টরে পাট চাষ হয়েছে।

সব মিলিয়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আবাদ বেড়েছে মাত্র ৭৪ হেক্টর। অর্থাৎ ‘লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে’ কথাটি ঠিক হলেও বৃদ্ধির পরিমাণ খুব বেশি নয়। বরং চার জেলার মধ্যে পাটের আবাদ ও উৎপাদনে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। সম্ভাব্য ৯০ হাজার ৫৩৫ মেট্রিক টন পাটের মধ্যে নড়াইলেই উৎপাদন হতে পারে ৫৭ হাজার ৬৭৫ মেট্রিক টন। সাতক্ষীরায় ২৫ হাজার ৬৫২, বাগেরহাটে ৪ হাজার ৪০১ এবং খুলনায় ২ হাজার ৮০৭ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চার জেলার মোট সম্ভাব্য উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসবে নড়াইল থেকে।

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সম্ভাব্য বাজারমূল্যের দিক থেকেও নড়াইল এগিয়ে। জেলাটিতে প্রায় ৫৭৬ কোটি ৭৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকার পাট বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। সাতক্ষীরায় ২৫৬ কোটি ৫১ লাখ ৬২ হাজার, বাগেরহাটে ৪৪ কোটি ১ লাখ ১২ হাজার এবং খুলনায় প্রায় ২৮ কোটি ৬ লাখ ৬২ হাজার টাকার সম্ভাব্য বাণিজ্যের হিসাব করা হয়েছে। ফলে নড়াইলে ফলন কমে যাওয়া, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা বা বাজারদর পড়ে গেলে পুরো খুলনা অঞ্চলের পাট অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়বে।

চলতি মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিতে পাটের জমিতে সেচের প্রয়োজন কমেছে। এতে কৃষকের খরচ কিছুটা কমেছে। খুলনার দিঘলিয়ার কৃষক শাহাবুদ্দিন বলেন, এবার বৃষ্টির কারণে জমিতে সেচ দিতে হয়নি। জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি থাকায় পাট জাগ দেওয়াও সহজ হয়েছে। তবে সেই বৃষ্টিই আবার কিছু কৃষকের জন্য সমস্যা তৈরি করেছে।

নড়াইলের কালিয়ার জোকারচর গ্রামের কৃষক তৈয়েবুর কাজী চার বিঘা জমিতে পাট করেছেন। তাঁর জমিতে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি জমে পাটগাছ ভেঙে পড়েছে। এতে পাট কাটতে বাড়তি শ্রমিক লাগছে, বাড়ছে খরচও। খুলনার বাওইসোনা গ্রামের কৃষক মাহতাব হোসেন বলেন, জাগ দেওয়ার জন্য পানির অভাব নেই। কিন্তু বৃষ্টি বেশি হওয়ায় এবং রোদ কম থাকায় আঁশ শুকাতে সমস্যা হচ্ছে। অর্থাৎ এবারের আবহাওয়ার চিত্র কৃষকের জন্য একদিকে সুবিধা তৈরি করেছে, অন্যদিকে নতুন ঝুঁকিও তৈরি করেছে।

এখন বিভিন্ন এলাকায় পাট কাটা শুরু হয়েছে। তেরখাদা, দিঘলিয়া ও নড়াইলের কালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষক-শ্রমিকদের ব্যস্ততা বেড়েছে। নদী, খাল, বিল ও পুকুরে চলছে পাট জাগ দেওয়ার কাজ।

তেরখাদায় পাট প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে যুক্ত মাহমুদ গাজী বলেন, ১৫ জন শ্রমিকের একটি দল দিনে প্রায় ৮০০ টাকা আয় করে। কোথাও কোথাও প্রতি আঁটি পাটের জন্য ৫ টাকা করে মজুরি দেওয়া হচ্ছে। পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে নারীদেরও অংশগ্রহণ রয়েছে। অনেক নারী পানিতে না নেমে আঁশ ছাড়ানোর কাজ করেন। বিনিময়ে কেউ কেউ নগদ মজুরির পরিবর্তে পাটকাঠি নেন।

কৃষকের মোট ব্যয়ের হিসাব করতে গেলে এই শ্রমের মূল্যও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের শ্রম কিংবা পাটকাঠির বিনিময়ে করা শ্রম অনেক সময় নগদ ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে আসে না। ফলে কৃষকের প্রকৃত উৎপাদন খরচও অনেক ক্ষেত্রে কম দেখানো হয়।

পাটের দাম নির্ধারণে আঁশের মান গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, জাগ দেওয়ার সময় কাদা-মাটি যাতে আঁশে না লাগে, সেদিকে কৃষকদের সতর্ক থাকতে হবে। ময়লা বা কালচে আঁশ হলে পাটের মান কমে যায়, বাজারদরও কমতে পারে। নড়াইলের কালিয়া ও সাতক্ষীরায় কৃষকদের সঠিকভাবে জাগ দেওয়া, আঁশ ধোয়া ও শুকানোর বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও রোদের স্বল্পতায় আঁশ শুকানো কঠিন হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত শুকানোর জায়গা না থাকায় কোথাও কোথাও কৃষকদের পাট নিয়ে বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে।

পাট চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন এলাকায় বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। নড়াইলে ৩ হাজার ২০০ কৃষককে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। কালিয়ায় ৬৫০ এবং সাতক্ষীরা সদরে ৫০০ কৃষক পেয়েছেন বীজ, ডিএপি ও এমওপি সার। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, উন্নত জাতের বীজ ও সার ব্যবহারে ফলন ভালো হচ্ছে। নড়াইলে তোষা ও ‘সবুজ সোনা’ জাতের পাটে ভালো ফলনের কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।

তবে মোট পাটচাষির তুলনায় কতজন কৃষক এই প্রণোদনা পেয়েছেন, সেই হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রণোদনার বাইরে থাকা কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমানোর সুযোগ কতটা রয়েছে, সেটিও কৃষকের লাভের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *