বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৯ অপরাহ্ন

ঈদকে সামনে রেখে রমজানের শুরুতেই দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সদরের শপিংমল বিপনী বিতানগুলোর গোডাউনে এখন শুল্কবিহীন অবৈধ ভারতীয় চোরাই পণ্যের মজুদ। পহেলা রমজান থেকেই এসব গুদাম থেকে আস্তে আস্তে বিপনী বিতানগুলোতে ভারতীয় পন্যের সরবরাহ বাড়ছে। পাশাপাশি দেদারছে চোরাই পথে ঢুকছে অবৈধ ভারতীয় পণ্য। বিজিবি কোষ্টগার্ড অভিযানে কোটি কোটি টাকার মালামাল আটক হলেও থেমে নেই চোরাচালানী সিন্ডিকেটের তান্ডব।
জানা গেছে, কলকাতার বিভিন্ন মার্কেট চোরাচালানিদের শক্ত ঘাঁটি। ওই ঘাঁটি থেকে কয়েকটি সিন্ডিকেট এসব পণ্য পাচার নিয়ন্ত্রণ করে। সিন্ডিকেট আছে সীমান্তের এপারেও। তারা খুলনা সাতক্ষীরা যশোর সহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে পণ্য সরবরাহ করে।
সূত্রমতে, বিগত দেড় বছর রাজনৈতিক কারণে ভারত থেকে বৈধ পথে আমদানি কমে যায়। যারা এলসি’র মাধ্যমে প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকার থ্রি পিচ শাড়ি গরম মশলা জিরা আমদানী করতো তারা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাব বোধ করে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। এছাড়া সরকার সমর্থিত ব্যবসায়ীদের অনেকেই এলাকা ছাড়া। কেউ কেউ মামলায় জড়িয়ে পলাতক ও জেলে। ফলে স্থল বন্দরগুলো দিয়ে গত দেড় বছরে স্মরণকালের সবচেয়ে কম আমদানি লক্ষনীয়। যে কারণে চাহিদা মেটাতে ব্যবসায়ীরা বিকল্প পথে ঝুঁকে পড়েছে। তাই অবৈধ পথে শুল্ক না দিয়ে আসছে শত শত কোটি টাকার পণ্য। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে চলছে রমরমা চোরাই পণ্য বাণিজ্য। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিটি ছোট-বড় শপিংমল, মার্কেট, বিপণি বিতান এখন ভারতীয় পণ্যের দখলে। লাখ টাকা দামের শাড়ি, লেহেঙ্গা, থ্রিপিস থেকে শুরু করে সব বয়সীদের শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, জুতা, সেন্ডেল প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। বাহারি নামের এসব পোশাকের চাহিদা ও লাভ অনেক বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এসব পণ্য মজুদ ও বিক্রিতে বেশি আগ্রহী। রাজধানীর বাইরেও প্রতিটি জেলা শহরে অবাধে বিক্রি হচ্ছে ভারতীয় পণ্য। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে নিয়ে আসা এসব পণ্যের আগ্রাসনে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশীয় শিল্প। সরকার হারাচ্ছে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদ উপলক্ষে এ বছর কয়েক হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়েছে। এর ৮০ ভাগই ভারত থেকে এসেছে। কিন্তু এসব পণ্য বৈধ পথে আসেনি। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকছে ভারতীয় পণ্য। আর এসবের মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে হু-িতে। এভাবে কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, ভারতীয় পণ্যের অবৈধ আমদানির কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশীয় শিল্পোৎপাদন। অবৈধ পথে আমদানিকারকদের শুল্ক পরিশোধ করতে হয় না। ভারত-বাংলাদেশের শক্তিশালী একাধিক সিন্ডিকেট এ কাজে জড়িত। রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় ভারতীয় পণ্য এ দেশে বাজারজাতকরণে তাদের খুব একটা বেগ পেতে হয় না। ব্যবসায়ীরা জানান, চোরাই পণ্য বিক্রিতে লাভ বেশি। শুল্ক ছাড়া এসব পণ্যের বাজার মূল্য অনেক কম থাকে। এ কারণে দেশীয় উৎপাদনমুখী শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারতীয় পণ্যের কাছে মূল্য ও মানে অনেক দেশীয় পণ্য মার খাচ্ছে। এ ছাড়া বৈধ পথে আমদানিকারকরাও এতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বেশি লাভজনক হওয়ায় বৈধ আমদানির চেয়ে অবৈধ আমদানির দিকেই ঝুঁকছেন তারা।
অভিযোগ উঠেছে, সাতক্ষীরা ও বেনাপোল সীমান্তে নিয়োজিত কতিপয় আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে চোরাচালানি সিন্ডিকেট অবৈধভাবে ভারতীয় পণ্য আনছে। আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এ সিন্ডিকেট এখন আরও সক্রিয়। দেদারসে দেশে ঢুকছে ভারতীয় পোশাক। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অভিজাত মার্কেটের ব্যবসায়ীরা এখন থেকেই ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঈদ পণ্যের মজুদ শুরু করেছেন।
জানা গেছে, শার্শা, বেনাপোল ও চৌগাছা এবং সাতক্ষীরার কলারোয়া দেবাহাটা ও কালীগঞ্জ সীমান্তের ২৫ থেকে ৩০টি পয়েন্ট দিয়ে সড়ক ও নৌ পথে ভারতীয় ঈদপণ্য দেশে ঢুকছে। কলকাতার পার্শ্ববর্তী ডায়মন্ড হারবারে চোরাচালানিদের শক্ত ঘাঁটি। ওই ঘাঁটি থেকে কয়েকটি সিন্ডিকেট পণ্য পাচার নিয়ন্ত্রণ করে। সেখান থেকে ট্রলারে শাড়ি, থ্রিপিস ইত্যাদি সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগর দিয়ে বাগেরহাট, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরিশালে এ দেশীয় সিন্ডিকেটের হাতে পৌঁছে দেয়া হয়। পরে তা মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও ট্রাকে চলে যায় ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার শপিং মলে।
জানা গেছে, বছরজুড়েই চোরাই পথে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে ঢোকে প্রায় শতাধিক ভারতীয় পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে- পোশাক, বাইসাইকেল, যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স, বিভিন্ন মশলা জাতীয় পণ্য, শিশুখাদ্য, শুঁটকি, চিনি, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ইত্যাদি। তবে ঈদকে সামনে রেখে ভারতীয় কাপড় (ফেব্রিক্স), শাড়ি, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা, ওড়না, শাল, পাঞ্জাবি, শার্ট, জুতা, সেন্ডেল ও বিভিন্ন কসমেটিকসের চোরাচালান এখন তুঙ্গে। এদিকে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় মাঝে মাঝে কিছু চোরাচালান জব্দ করা হলেও যে পরিমাণ পণ্য পাচার হয় তা তার এক সিকি ভাগও নয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ উঠেছে, সীমান্তে নিয়োজিত কতিপয় আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে চোরাচালানি সিন্ডিকেট অবৈধভাবে এসব পণ্য আনছে।