বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৪ পূর্বাহ্ন

– ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগীর চাপ এবং তীব্র জনবল সংকটের কারণে চরম অব্যবস্থাপনা
– বর্হিবিভাগে শত শত রোগীর ভিড় থাকলেও সময়মত ডাক্তারদের দেখা মিলছে না
– হাসপাতালগুলোতে সাপ্লাই থাকলেও ইমার্জেন্সি রোগীদের তুলা গজ ব্যান্ডেজ সূতা ভায়োডিন পর্যন্ত কিনতে হয়
ভেঙ্গে পড়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের স্বাস্থ্য সেবা। সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত লাখ লাখ মানুষ। চিকিৎসকরা যেমন স্বেচ্ছাচারি হয়ে উঠেছে তেমনি প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া রোগীরা। যেন দেখার কেউ নেই। প্রতিদিন মিডিয়ায় কোন না কোনভাবে উঠে আসছে এসব চিত্র। তবুও বেপরোয়া এই সেক্টরের কর্তা ব্যক্তিরা।
এ অঞ্চলের অধিকাংশ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগীর চাপ এবং তীব্র জনবল সংকটের কারণে চরম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। বহির্বিভাগে দীর্ঘ সারি, মেঝে ও বারান্দায় রোগীদের চিকিৎসা নেওয়া, এবং ওষুধ ও টেস্ট বাণিজ্যের মতো অনিয়ম নিয়মিত চিত্র। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে চরম অব্যবস্থাপনা, শয্যা সংকট, এবং চিকিৎসক ও জনবল ঘাটতি রয়েছে। পুরোনো ভবনের বেহাল দশা ও স্বাস্থ্য সরঞ্জামের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা। ধারণক্ষমতার তিনগুণের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন, ফলে মেঝে ও বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। এছাড়া হাসপাতালে অগ্নিকা-ের মতো বড় দুর্ঘটনাও ঘটেছে, যা রোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোর স্বাস্থ্যসেবা যেন কসাইখানা। যার ফলে মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্তরা চিকিৎসা সেবা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। আর যাদের সঙ্গতি রয়েছে তার বাধ্য হয়ে ছুটছে ভারতসহ দেশের বাইরে। গত এক সপ্তাহে ভারতের ভিসা প্রসেসিং সহজ করায় প্রায় দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল থেকে ৭৪ হাজার আবেদন জমা পড়েছে ভিসার জন্য।
এদিকে খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশু রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা হামের হটস্পটে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিশু রোগীদের জরুরি চিকিৎসায় খুলনার কোনো সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ ও ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা নেই। ফলে কোমলমতি শিশুদের চিকিৎসা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় রয়েছেন অভিভাবকরা।
সূত্রমতে, এ অঞ্চলের সরকারী হাসাপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকায় মেঝে ও বারান্দায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হয়। বর্হিবিভাগে প্রতিদিন সকাল থেকেই শত শত রোগীর ভিড় থাকলেও সময়মত ডাক্তারদের দেখা মিলছে না। হাসপাতালগুলোতে পরীক্ষা নিরীক্ষার সকল যন্ত্রপাতি থাকলে তা অচল ও টেকনেশিয়ানের অভাবের কারণ দেখিয়ে রোগীদের ভোগান্তি নিত্যদিনের ঘটনা। হাসপাতালগুলো ওষুধ থাকা স্বত্তে¦ও ভর্তি রোগীদের ৮০ শতাংশ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। যাদের অপারেশন হচ্ছে তাদের অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ গজ ব্যান্ডেজ ইঞ্জেকশনসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি এসব অসহায় গরীব রোগীদের পকেটের টাকা দিয়ে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে টেন্ডারে অপারেশনের সূতা কেনা হলে সরজমিনে খোজ নিয়ে জানা যায় প্রতিদিন প্রতিটি রোগীকে তা বাইরে থেকে কিনতে হয়। এমনকি ইমার্জেন্সি রোগীদের প্রতিনিয়ত তুলা গজ ব্যান্ডেজ সূতা থেকে শুরু করে বায়োডিন পর্যন্ত কিনতে হয়। এ যেন মগের মুল্লুক। যেন দেখার কেউ নেই।
এদিকে, বিভিন্ন পরীক্ষা-বাহুল্য এবং দালালদের খপ্পরে পড়ে রোগীদের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সরকারী হাসপাতালগুলো যেন দালালদের স্বর্গরাজ্য। চিকিৎসক নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষদের সাথে রয়েছে এসব দালালদের আতাত। তাছাড়া পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সের অভাবে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে বাইরের বিভিন্ন কোম্পানীর যেসকল ওষুধ টেন্ডারের মাধ্যমে সরবরাহ রয়েছে তার অধিকাংশ ওষুধ ভূয়া চাহিদাপত্র দেখিয়ে উত্তোলন করে তা বাইরে পাচার হচ্ছে। এসব কর্মকান্ডের সাথে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, ষ্টোরকিপার, ফার্মাসিস্ট চক্র জড়িত রয়েছে। গত ২ বছর পূর্বে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওষুধ পাচারকালে এ সিন্ডিকেট চক্র হাতেনাতে ধরা পড়ে। এ ঘটনা খুলনা বিভাগের ১০ জেলার অধিকাংশ সরকারি সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে ঘটছে।
অপরদিকে, অপরিচ্ছন্ন টয়লেট ও নোংরা পরিবেশের কারণে সেবাগ্রহীতারা চরম ভোগান্তির শিকার হন। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী খুলনার সরকারি হাসপাতালগুলোতে পরিদর্শনকালে তা সামনে উঠে আসে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে যে খাবার দেয়া হয় তা খাবার অযোগ্য প্রায়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি হাসাপাতালগুলো অনেক সময় ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনের পাশাপাশি একটি আলাদা কাগজ ধরিয়ে দেন। তাতে লেখা থাকে মোবাইল নম্বর। বলা হয়, এই নম্বরে ফোন করলে দ্রুত পরীক্ষা হয়ে যাবে। কিন্তু ফোন করলে হাজির হয় এক বহিরাগত। হাতে ব্যাগ, সিরিঞ্জ, তুলা। তিনি রোগীর কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে, টাকা নেন এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট দিয়ে যান বেডে। রোগীরা ভেবে নেন, এটি সরকারি হাসপাতালের প্রক্রিয়া। পরে দেখা যায়, রিপোর্টে লেখা থাকে বাইরের কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম।
বাংলাদেশ পরিবেশ ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সোসাইটির খুলনা বিভাগীয় মহাসচিব মো: আজগর হোসেন বলেন, যেখানে গরিব মানুষ চিকিৎসার শেষ আশ্রয় খুঁজতে আসে, সেই জায়গাটাই যদি দালালচক্র দখল করে নেয়, তবে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আস্থা টিকবে কীভাবে ?
তিনি আরও বলেন, দালালচক্র ও অনুমোদনহীন ক্লিনিক বন্ধ করতে হলে হাসপাতালের প্রবেশ পথে কঠোর নিরাপত্তা ও সিসিটিভি নজরদারি বাড়াতে হবে, বহিরাগত প্রবেশ সীমিত করতে হবে, কমিশন বাণিজ্যে জড়িত চিকিৎসক ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এছাড়া সরকারি হাসপাতালে দ্রুত ও মানসম্মত পরীক্ষা নিশ্চিতসহ অনুমোদনহীন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করতে হবে।