শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবনে আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে গোলপাতা আহরণ। সুন্দরবনে ১২ মাসই কোনো না কোন মৌসুম থাকে। আর গোলপাতা হচ্ছে অন্যতম অর্থকারী বৃক্ষ। প্রতিবছর গোল গাছের পাতা কেটে জীবিকা নির্বাহ করেন সাড়ে চারশ বাওয়ালী। তবে পাতা সংগ্রহ করতে হয় বন বিভাগের বেঁধে দেয়া সময় অনুযায়ী। এবছর আজ ০৩ মার্চ সকাল থেকে গোলপাতা আহরণ শুরু হয়ে চলবে ৩১ মার্চ পর্যন্ত। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় গোলপাতা আহরণের সময়সীমা কম হওয়ায় বাওয়ালীদের মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।
গোলপাতা সংগ্রহের মৌসুম সামনে রেখে সুন্দরবনসংলগ্ন নদীতীরের জনপদে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন বাওয়ালিরা। আজ থেকে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে তাঁরা সুন্দরবনে প্রবেশ করে গোলপাতা আহরণ করতে পারবেন। ৩১ মার্চ পর্যন্ত চলবে এ মৌসুম। নৌকা মেরামতের এই শেষ সময়কে বাওয়ালিরা বলেন ‘শারণের সময়’।
তবে এবার গোলপাতা আহরণের সময়সীমা কমানো হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাওয়ালিরা। সুন্দরবন বাওয়ালি ফেডারেশনের সভাপতি মীর কামরুজ্জামান জানান, আগে প্রতিবছর দুই দফায় মোট ৫৬ দিনের অনুমতি দেওয়া হতো। এবার এক দফায় মাত্র ২৮ দিনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা বননির্ভর মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করবে।
সুন্দরবন থেকে যাঁরা গোলপাতা সংগ্রহ করেন, স্থানীয়ভাবে তাঁদের বলা হয় বাওয়ালি। গোলপাতা বহনের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ নৌকাগুলো আকারে বড় হওয়ায় অনেকেই সেগুলোকে ‘বড় নৌকা’ বা ‘পেটকাটা নৌকা’ নামে চেনেন। বন বিভাগের অনুমতি অনুযায়ী, ৫০০ মণ (১৮৬ কুইন্টাল) ধারণক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিটি নৌকা ২৮ দিন সুন্দরবনে অবস্থান করে নির্ধারিত স্পট থেকে গোলপাতা সংগ্রহ করতে পারবে। সুন্দরবনের গোলপাতা ঘরের ছাউনিতে ব্যবহার হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু রিসোর্ট ও বাংলো বাড়িতে শোভাবর্ধণের জন্যও গোলপাতার ছাউনি দেয়া হয়। মৌসুমে প্রতি কুইন্টাল গোলপাতা আহরণে ভ্যাট ব্যতিত রাজস্ব নেয়া হচ্ছে ৬০ টাকা।
বনবিভাগ জানায়, অনুমতি ছাড়া কোনো বাওয়ালী বনের প্রবেশ করতে পারবে না। সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জে দুইটি গোলপাতার কূপ রয়েছে। একটি হলো শ্যালা গোলপাতা কূপ আর অপরটি হলো চাঁদপাই গোলপাতা কূপ। গোলপাতা আহরণের সময় বনের অন্য কোনো ধরনের গাছপালা কাটা যাবে না। কোনো বাওয়ালী যদি গোলপাতার পাশাপাশি অন্য প্রজাতির গাছ কাটেন কিংবা বনের ক্ষতি করেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বন আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বাওয়ালীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবন থেকে বনজদ্রব্য আহরণ সংকুচিত এবং চাহিদা কমে যাওয়ায় গোলপাতা সংগ্রহে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে বাওয়ালীরা। বাওয়ালী হাবিবুর রহমান সানা জানান, ২৫ বছর ধরে তিনি সুন্দরবন থেকে গোলপাতা সংগ্রহ করে আসছেন। আগে গোলপাতার খুব চাহিদা ছিল, দামও ছিল ভাল। এখন আর গোলপাতার সেই কদর নেই।
১৩ বছর ধরে গোলপাতা আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করা মোংলার দক্ষিণ চরের বাসিন্দা বাওয়ালী মোজাম্মেল হাওলাদার বলেন, গোলপাতা কাটতে যাওয়ার জন্য নৌকা, বাঁশ, দড়ি ও ধারালো দা-ছুরি তৈরি করেছি।
খুলনার কয়রা উপজেলার কয়রা নদীর চরে দাঁড়িয়ে বাওয়ালি আবদুল গনী জানান, “তাঁর বড় নৌকাটি তৈরি হয়েছে ১৪ বছর আগে। প্রতি মৌসুমের আগে সেটি মেরামতে লাখ টাকার বেশি খরচ হয়। বর্তমানে নতুন একটি নৌকা নির্মাণে ব্যয় প্রায় সাত লাখ টাকা।” তিনি আরও বলেন, “গোলপাতা বহনের এসব নৌকা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যায় না। মৌসুম শেষে তাই সেগুলো নদীর চরে ফেলে রাখতে হয়।
অপরদিকে সুন্দরবনের বনদস্যুদের আতঙ্কে বাওয়ালীরা দিন কাটাচ্ছে। বর্তমানে সুন্দরবনে বনদস্যুদের উৎপাত চরমভাবে বেড়ে যাওয়ায় উৎকন্ঠায় তারা। বিগত ৫ বছর আগে প্রতি মৌসুমে মহাজনদের গোলপাতা নৌকা বাবদ চাঁদা দিতে হতো জলদস্যুদের। এরপর জলদস্যুরা আত্মসমার্পন করলে বাওয়ালীরা জলদস্যুদের হাত থেকে পরিত্রান পায়। কিন্তু সম্প্রতি একের পর এক জেলে বাওয়ালী অপহরণের ঘটনায় তারা যথেষ্ট শঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ আব্দুল কাদের বেগ ইনকিলাবকে বলেন, মৌসুমের শুরুতেই ডাকাতদের বিরুদ্ধে যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা না যায় তাহলে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
এ বিষয়ে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনের ওপর চাপ কমাতেই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ৩ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত নির্ধারিত স্পট থেকে গোলপাতা আহরণ করা যাবে। প্রতিটি নৌকায় সর্বোচ্চ ১৮৬ কুইন্টাল বা ৫০০ মণ বহনের অনুমতি রয়েছে। অতিরিক্ত বহন করলে দ্বিগুণ জরিমানা করা হবে। গোলপাতা ছাড়া অন্য কোনো কাঠ সংগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলেও তিনি জানান।