বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩১ অপরাহ্ন

নতুন সরকার গঠনের পরেও থেমে নেই রক্তাক্ত জনপদ বলে খ্যাত খুলনায় হত্যাযজ্ঞ্য। র্যাব পুলিশ নতুন উদ্যামে অভিযান চালালেও গান ফায়ার থামছে না। হচ্ছে না অস্ত্র উদ্ধার। আটক হচ্ছে না তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। বরং টপ কিলার বাহিনীগুলো এখন মরিয়া রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে। মাদক বেচা কেনা আধিপত্য বিস্তার চাঁদাবাজি এবং ঘাপটি মেরে থাকা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সদস্যদের নতুন করে উত্থানের কারণে একের পর এক হত্যাকান্ড ঘটে চলেছে খুলনাঞ্চলে।
গত ৫ দিনে খুলনায় ৪টি হত্যাকা- ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে খুলনা মহানগরীতে ৩টি এবং জেলায় একটি হত্যাকা- ঘটে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এসবের পেছনে রয়েছে সাতটি সন্ত্রাসী বাহিনী। তারাই খুলনার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে।
সর্বশেষ গতকাল বুধবার রাত ৯টার দিকে খুলনায় বাটার শোরুমে ঢুকে কুপিয়ে ও গুলি করে রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা শ্রমিক দলের আহবায়ক মাসুম বিল্লাহকে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এ সময় দৌড়ে পালাতে গিয়ে পুলিশের হাতে অস্ত্র সহ অশোক ঘোষ (৩৮) নামে এক শুটার আটক হয়েছে।
নগরীর ডাকবাংলা মোড়ে অবস্থিত বাটা শো-রুমে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মাসুম বিল্লাহ রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামের মৃত মিনহাজ উদ্দিন মুন্সির ছেলে। নিহত মাসুম বিল্লাহ রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এবং উপজেলা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক ছিলেন।
খুলনা অঞ্চল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অন্ত সাতটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। ফলে প্রায় দিনই অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে। খুনও হচ্ছে। নির্বাচনের আগে থেকে এসব শীর্ষ সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারীদের গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু হয়েছিল। কিন্তু বেশিরভাগ সন্ত্রাসী-অস্ত্রধারী, অপরাধী, চরমপন্থি ও দস্যু গ্রেফতার হয়নি। তাদের গ্রেফতার করতে না পারায় এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
গত দেড় বছরে খুলনা নগরীতে একাধিক সন্ত্রাসী সংগঠনের উত্থান, মাদক কারবার নিয়ে দ্বন্দ্ব, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিনিয়ত খুনোখুনি হচ্ছে। এ সময়ে ৬০টি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় সন্ত্রাসীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে, এমন দাবি সাধারণ মানুষের।
এদিকে খুলনার প্রতিটি বস্তিতে একাধিক অস্ত্রধারীর অবাধ বিচরণ থাকায় প্রশাসন উদ্বিগ্ন। পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্যমতে, মহানগরীর অর্ধশতাধিক বস্তিতে দুজন করে প্রশিক্ষিত শুটার রয়েছে। এ ছাড়া এসব বস্তিতে গড়ে চারজন করে নারী মাদক বিক্রেতা রয়েছে। যারা খুবই ভয়ানক।
খুলনার দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবু ও পলাশ গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। তাদের দ্বন্দ্বের কারণে খুলনায় অনেক হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে। সর্বশেষ গত রোববার রাত ৯টার দিকে নগরীর নিরালা মোড়সংলগ্ন জাহিদুর রহমান ক্রস রোডে ওই দুই বাহিনীর বিরোধের জেরে আব্দুল আজিজ নামের এক যুবক খুন হন। তিনি পলাশ বাহিনীর হয়ে কাজ করতেন।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য আফিল গেট এলাকার পেট্রলপাম্প-সংলগ্ন একটি গ্যারেজে অবস্থান করছিলেন ঘের ব্যবসায়ী সোহেল শেখ। বেলা ৩টার দিকে একটি মোটরসাইকেলে এসে দুই যুবকের একজন তাঁকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি করে। একটি গুলি তাঁর মাথায় বিদ্ধ হলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। এ ঘটনায় মামলা করা হলেও হত্যার কোনো ক্লু বের করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি। এ ঘটনার এক দিন পর দিঘলিয়া উপজেলার পথের বাজারে ইজারার টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে হত্যাকা-ের শিকার হন সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদলের নেতা মুরাদ খান।
খুলনা মহানগর পুলিশের ডিসি সাউথ তাজুল ইসলাম বলেন, খুলনাঞ্চল মুলত চরমপন্থীদের এক সময়কার বড় ঘাটি। র্যাব পুলিশের অভিযানে এ ঘাটি তছনছ করা হয়। কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আরও উদ্ধার হলে ভাল হতো। সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারে ডিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কেএমপি’র বাইরে ডুমুরিয়া, ফুলতলা, দৌলতপুর, তালাসহ বেশ কিছু এলাকায় চরমপন্থিদের তৎপরতা রয়েছে। কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, মোংলা, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা এলাকায় বনদস্যুদের দাপট আছে। এ সকল বনদস্যুদের সাথে চরমপন্থীদের এবং কিলারদের মিউচ্যুয়াল আন্ডারষ্ট্যান্ডিং রয়েছে। যে কারণে এখনও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে কেএমপি’র গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। চেষ্টা করা হচ্ছে সীমান্ত জেলা থেকে সন্ত্রাসী কেএমপি’র ভিতর ঢুকে কোন অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে।
একটি সূত্র জানায়, ‘মহানগরীতে কিশোর গ্যাং নিয়ে গড়ে ওঠে রোহান ও পলাশ গ্রুপ। পরবর্তীতে এটি ভেঙে তিনটি বাহিনী পলাশ, গ্রেনেড বাবু এবং নুর আজিম হয়। দৌলতপুরের শীর্ষ চরমপন্থি হুমায়ুন কবির হুমা, আরমান শেখ ও নাসিমুল গণির আলাদা বাহিনী আছে। নাসিমুল গণি শীর্ষ সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলায় দ-াদেশপ্রাপ্ত আসামি। সে জেলে থাকায় এই বাহিনী কিছুটা নিষ্ক্রিয় ছিল। গত বছরের ২৮ নভেম্বর উচ্চ আদালত থেকে জামিন পায় নাসিমুল গণি এবং অপর বাহিনী প্রধান আরমান শেখ। এরপর তারা খুলনার কারাগার থেকে মুক্তি পায়। ফলে খুলনায় এখন সাতটি বাহিনী সক্রিয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।’
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) ত ম রোকনুজ্জামান বলেন, ‘খুলনার প্রতিটি বস্তিতে কমপক্ষে দুজন করে শুটার রয়েছে। তারা এক স্থানে থাকে না। তারা ভাড়াটে হিসেবে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হয়ে বেআইনি কাজ করে থাকে।
এদিকে খুলনায় পরপর তিন খুন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে খুলনার নাগরিক সমাজ। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।